প্রেত কথা
অনিমা মুখার্জী, শিবপুর, হাওড়া
আজ থেকে প্রায় বছর দশ আগের কথা। সময়টা ছিল ভাদ্র মাস। এমনিতে অফিসের পুজোর ছুটিতে প্রতিবছর দেশের বাইরে যাই। তবে সে বছর পুজোর বেশ কিছুদিন আগেই অরন্ধনের সময় মালিককে বলে একটা লম্বা ছুটি আদায় করে নিয়েছিলাম। পুজোর বোনাস পেয়ে বাড়ির সকলের জন্য নতুন জামা কাপড় কিনে মনটা বেশ ভালো লাগছিল। তার ওপর এ বছর কয়েকটা দিন বেশি ছুটি কাটাতে পারব এই ভেবে মনটা আরো উচ্ছ্বসিত। কতদিন পর মায়ের হাতের সেই অরন্ধনের রান্নার স্বাদ পাবো--আহা, নিজেকে আর যেন ঠিক রাখতে পারছিলাম না। তাই সব গোছগাছ সেরে দুপুর আড়াইটার লোকাল ধরে রওনা দিলাম ট্রেনে। প্রায় চার ঘন্টা লাগে, ট্রেন থেকে নেমে আরো আধঘন্টার হাঁটাপথ।
এত বছর পর অরন্ধনের বাড়ি যাচ্ছি অথচ জোড়া ইলিশ নেব না তা কি করে হয় ? তাই স্টেশনে নেমে সামনের বাজার থেকে একজোড়া টাটকা ইলিশ কিনে নিলাম--সবাই মিলে জমিয়ে খাওয়া যাবে।
স্টেশনে যখন নামলাম তখন বেশ অন্ধকার, কলকাতা শহরে অবশ্য এটা সন্ধ্যে। আলোর ঝলকানিতে রাত্রিকে দিন মনে হয়। স্টেশনে দু একটা রিক্সা দাঁড়িয়েছিল ঠিকই কিন্তু আমি পায়ে হেঁটেই এগোলাম। আমাদের এ দিকটা খুব সুন্দর, দুদিকে নদী, মাঝখানে খুব চওড়া লাল মাটির রাস্তা, তার কিছুটা জাগা জুড়ে আছে একটা বাঁধ। এই মনোরম প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবো বলেই হাঁটা পথ বেছে নিয়েছিলাম।
নদীর মাঝ বরাবর দুই প্রান্তে অনেক পুরনো দুটো বটগাছ আছে। যার ঝুড়িমূল দেখলেই গাছের বয়স অনুমান করা যায়।
কিছুদূর যাবার পর মনে হল একটা গাছের শাখার ওপর একটা পা আর অন্য গাছের মাথার ওপর আর একটা পা নিয়ে দৈত্যাকার কে যেন দাঁড়িয়ে আছে ! একবার মনে হল এটা হবে আমার চোখের ভুল--এমন বিশালকায় চেহারার কেউ আবার হয় নাকি ! নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল--কি করবো ? কোথায় যাবো ? জনমানব শূন্য এই পথে কারোর থেকে সাহায্য চাইবো তারও কোনো উপায় নেই--তা হলে?
আর কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে চোখ বন্ধ করে মাটিতে বসে ইস্টনাম জব করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর মনে হল এক দিকের পাটা যেন তুলে নিল তখন এক মুহূর্ত আর অপেক্ষা না করে এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে সোজা বাড়ি বাড়ির দাওয়ায় এসে মাটিতে পড়ে জ্ঞান হারালাম।
কতক্ষন পর জানি না--যখন জ্ঞান এলো তখন দেখলাম আমি ঠাকুরমার বিছানায় শুয়ে। আমার মা হাতপাখা নিয়ে হাওয়া করছে। বাড়ির সবাই জিজ্ঞাসা করাতে ঘটনাটা খুলে বললাম। ওরা বললো, আজ বেশ কিছুদিন হল এই ঘটনার সাক্ষী গ্রামের নাকি অনেকেই হয়েছে। কিন্তু এর রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি এখনো।
যাইহোক, আমি এখন অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি। তবে বাড়ির জন্যে যে জোড়া ইলিশ কিনে ছিলাম, সেটা কোথায় ? সেটা তো নেই ! সবাই বলল, আমি যখন দেওয়ায় এসে জ্ঞান হারাই আমার হাতে নাকি ফাঁকা ছিল। তাহলে ওই এক জোড়া ইলিশ কোথায় গেল--তবে কি সেই সেই…?
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment