Sunday, 5 September 2021

মহুয়া ব্যানার্জী--অমীমাংসিত


 


অমীমাংসিত

মহুয়া ব্যানার্জী

 

ঢং ঢং করে বারোটা ঘন্টা বাজল মিশ্রবাড়ির  বড় ঘরের বিশাল ঘড়িটায়। সারা বামুনপাড়া গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। যে কজন জেগে আছে তারা এই ঘন্টা শুনে বুঝল যে রাত বারোটা বাজে। যেসব ছাত্রছাত্রী রাত জেগে পড়ছিল তারা কেমন একটা ভয়ে তাড়াতাড়ি বই বন্ধ করে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।মিশ্রবাড়ির গা ঘেঁসে থাকা বাড়িগুলোয় সবাই কানে বালিশ বা চাদর চাপা দিয়ে প্রাণপনে চোখ বুজে ঘুমোবার চেষ্টা করছে। কেমন যেন অজানা আতঙ্ক সবার মধ্যে বাসা বেঁধেছে। আতঙ্কের কারণটা দিনের বেলায় বড় তুচ্ছ মনে হয়। কিন্তু যেই রাত বাড়তে থাকে এক অদ্ভূত ভয় ঘিরে ধরে এই পাড়ার মানুষগুলোকে। ভয়টা একটা শব্দকে কেন্দ্র করে। মিশ্রবাড়ির টানা বারান্দার ঠিক মাঝামাঝি একটা দোলনা রয়েছে। সেই দোলনার উল্টোদিকে পাশাপাশি চারটে ঘর চার ছেলে- বৌয়ের। দোলনা আর ঘরগুলোর মাঝে কেবল বারান্দার ফাঁকা মেঝে। একপাশে মস্ত বড় পুকুর আর তার এক পাশে  বাঁশ আর বুনো ঝোপের জঙ্গল,  যা এই বারান্দার পিছন দিকে ছড়িয়ে গেছে। রাতে বেশ গা ছমছম করে ওদিকে তাকালে। খটাস, ভামের জ্বলন্ত চোখ উঁকি মারে গৃহপালিত হাঁস, মুরগির লোভে। বারান্দার ওই দোলনাটা বড় প্রিয় রূপার। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে দোলনায় বসে পুকুর দেখে। পুকুরের অপর পাড় দিয়ে পাড়ার রাস্তাটা এঁকেবেঁকে হারিয়ে গেছে ঘরবাড়ি  আর খেতের ভেতর। সারাদিন লোকচলাচলে সরগরম এই পাড়া রাত বাড়লেই নিশ্চুপ। রূপার দোলনায় বসার সময় বেঁধে দিয়েছে বাড়ির লোকেরা। রাত দশটা পর্যন্ত যখন খুশি যে কেউ এই দোলনায় বসতে পারে। কিন্তু তারপর একদম নয়। 

রাত দশটা বড় জোর সাড়ে দশটার মধ্যেই সবাই খেয়ে দেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। কিন্তু ঘুমোয় না। সবাই অপেক্ষা করে ওই শব্দটার। রূপাদের ঘরখানা দোলনার ঠিক মুখোমুখি। ফলত সে আর তার মা বাবা বোন সবচেয়ে বেশি তীব্র ভাবে শুনতে পায় শব্দটা। 

প্রতিদিন রাত বারোটার পর থেকেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে দুলতে থাকে দোলনাটা। প্রথমে ধীরে ধীরে তারপর দুলুনি বাড়তে বাড়তে তীব্র হয় শব্দটা। একসময় নিজে নিজেই থেমে যায়। ঠিক যেন কেউ দোলনায় বসে দুলছে অথচ সবাই জানে যে কেউ কোথাও নেই। রূপার দাদারা একবার ভেবছিল দল বেঁধে ওই সময় বারান্দায় যাবে ঘটনাটা কি তা দেখতে। কিন্তু দাদু বারণ করে দেয়। দাদুর মুখ থেকে জানতে পারে যে এইখানে প্রথমবার দোলনা বাঁধার পর থেকেই এই ঘটনা ঘটে চলেছে। প্রথম প্রথম তিনিও ভাবতেন যে হাওয়ায় দুলছে। কিন্তু বছরের পর বছর একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ছন্দে দোলনার দোলা কোন হাওয়ার দ্বারাই সম্ভব নয়। তারপরই ঘটে সেই ভয়াবহ ঘটনা। 

 

রূপার ছোটকাকু দিল্লি থেকে পুজোয় বাড়ি এসেছিলেন। পরের দিন ভোরে দোলনার সামনে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। চোখদুটো ভয়ানক আতঙ্কে বিস্ফারিত। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে জানা যায় যে হঠাৎ করে কোন শকের জন্য হার্ট ফেল হয় কাকুর। 

শুধু রাজু আসল ঘটনা বলে সবাইকে।রাজু সেদিন ছোটকার সাথেই শুয়েছিল।  ছোটকাকু নাকি সেদিন রাতে দোলনার শব্দ শুনে থাকতে না পেরে দরজা খুলে বাইরে গিয়েছিল। রাজু কোনমতে  ভয়ে খাটের তলায় চোখ বন্ধ করে পড়ে ছিল। সকাল হতেই তারপর এই দুঃসংবাদ পায়। 

তারপর থেকেই গোটা পাড়াকে এক অজানা আতঙ্ক গ্ৰাস করে। রাতের বেলায় ডিউটি ফেরত লোকেরা মিশ্রবাড়ির রাস্তা দিয়ে যায় না।  যদি বা কেউ যেতে বাধ‍্য হয় তবে সে চোখ বন্ধ করে কানে চাপা দিয়ে এক দৌড়ে পার হয় জায়গাটা।

তারপর আরও দু খানা এমন অস্বাভাবিক মৃত্যুর সাক্ষী হয় ওই বারান্দা। একজন পাশের বাড়ির মৃত‍্যুঞ্জয়, অপর জন রূপাদের বাড়ির মুনিষ নিতাই দা। সেই সময় তাদের সঙ্গে ঘরের ভেতর যারা ছিল তাদের বক্তব্য একই। দোলনার দুলুনির একঘেয়ে শব্দ  শুনতে শুনতে কেমন উত্তেজিত হয়ে তারা দরজা খুলে বেরিয়ে গিয়েছিল। তারপর সেই একই ভাবে বিস্ফারিত চোখে আতঙ্কের মৃত্যুবরণ। 

তারপর থেকেই সকলেই ওই শব্দটা এড়ানোর চেষ্টা করে। দোলনাটা ওই জায়গা থেকে বহুবার খুলে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও রাতে সেই দুলুনির শব্দ শোনা যেত। সকালে সবাই অবাক হয়ে দেখত দোলনাটা আগের মতই রয়েছে বারান্দায়। 

সেই থেকেই সবাই রাত হলেই ভয়ে ভয়ে থাকে। 

রূপা ছোট থেকেই এইসব জানে। কিন্তু তবুও রোজ রাতে এই আওয়াজ তাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে । এক এক সময় মনে হয় দরজা খুলে দেখে দোলনার রহস্য কি। কিন্তু সামলে নেয় নিজেকে। আজকেও সে জেগে। ঘড়ির ঘন্টার আওয়াজ তার কানেও গেছে। আর তারপরেই শুরু হল সেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ। শব্দটা বাড়তে বাড়তে তীব্র হয়ে রূপার মাথায় যেন বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। সে আর থাকতে না পেরে পাগলের মত দরজা খুলে দিল। ঘরের চৌকাঠ পেরোনোর আগেই কে যেন তার চোখে হাত দিয়ে ঢেকে তাকে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দরজা আবার বন্ধ করে দিল। তাকিয়ে দেখে তার  বাবা। বাবা তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। ওদিকে শব্দটা তীব্র হয়ে তাদের বন্ধ দরজায় আছড়ে পড়ছে। যেন শিকার হাতছাড়া হওয়ার আক্রোশ। কিছুক্ষণ এমন দাপাদাপির পর সব শান্ত হয়ে গেল। ঘড়িতে তখন সাড়ে তিনটে। ভোর হবে এবার। 

তারপর বহুবছর কেটে গেছে। ওই জায়গাটা পরিত‍্যক্ত হয়ে গেছে। দোলনাটাও নষ্ট হয়ে গেছে। 

রূপারা অন‍্য পাড়ায় নতুন বাড়ি করেছে। কিন্তু এখনও ওই জায়গা থেকে রাতের বেলা ভেসে আসে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে দোলনার দুলুনির শব্দ।

 

No comments:

Post a Comment

সম্পাদকীয়--

সম্পাদকীয়-- অজানার মাঝে রহস্যময়তা লুকিয়ে থাকে। জন্ম-মৃত্যু বুঝি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড়  রহস্য। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আমরা অভ্যস্ত, অভ...