Friday, 3 September 2021

তাপসকিরণ রায়--আকাশের তারা


 

আকাশের তারা

তাপসকিরণ রায়


রমাকান্তর মনের অবস্থা খুব খারাপ চলছিল। দিন পনের অফিস কামাই দিয়েছেন। তার একমাত্র মেয়ে টিমটিম দিন দশ আগে মারা গেছে। ডক্টর রোগ ধরার আগেই মাত্র দুদিনের জ্বরে সে মারা গেল। টিমটিমের মা আজও পাগলের মত কাঁদছেন। 


দেখতে দেখতে আজ বারো দিন হয়ে গেল, শোকের এতোটুকু ভার রমাকান্ত ও তাঁর স্ত্রীর মন থেকে কাটেনি। সব সময় মনে হয়, এই বুঝি টিমটিম, মা-বাবা, বলে ডেকে উঠবে, খিলখিল করে হেসে উঠবে, রমাকান্তর কোলে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু না, যে যায় সে বুঝি আর ফিরে আসে না! 

রমাকান্তর সারাদিনটা আর কাটতে চায় না। টিমটিমের স্মৃতি সারাক্ষণ তাঁর মনে গিজগিজ করতে থাকে। বাড়ির পাশে একটা দীঘি আছে, তার শান বাঁধানো ঘাট আছে। দুদিন ধরে একটু রাত হলে তিনি হাঁটতে হাঁটতে  দীঘির পারে চলে যান। চারপাশে নিস্তব্ধতার মাঝে শান বাঁধানো সিঁড়িতে গিয়ে চুপ করে তিনি বসে থাকেন।

চারদিক থেকে নির্জনতা তাকে ঘিরে ধরে। রমাকান্ত জলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন, নিঃসঙ্গতার মাঝে ডুবে থাকার চেষ্টা করেন। 

সে দিনও তিনি পুকুর ঘাটে চুপচাপ বসে আছেন, আকাশে চাঁদ উঠেছে, আকাশে তারা ফুটেছে, আকাশ দেখতে দেখতে তিনি পুকুরের জলের দিকে তাকালেন। স্বচ্ছ জল, চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে, ঠিক এমনি সময় টুং টুং টুং, একটা শব্দ, মৃদু একটা শব্দ তার কানে ভেসে এলো। বেশ মিষ্টি সে শব্দ, তিনি তাকালেন চারপাশে-- তখনো শব্দটা হচ্ছে, এবার তিনি চমকে উঠলেন। একি দেখছেন তিনি ? আকাশ থেকে একটা তারা ধীরে ধীরে নেমে আসছে না ! অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন তিনি। একটা তারা পুকুরের পারে নেমে এসেছে। আর ছোট্ট একটা মেয়ে সেই তারা থেকে বেরিয়ে আসছে! মুহূর্ত পরেই আবার চমকে উঠলেন তিনি। দেখতে পেলেন, তার সামনে দাঁড়িয়ে টিমটিম হাসছে। এ কি হল! তিনি কি স্বপ্ন দেখছেন? --আমি এসেছি বাবা-- 

অনেক কষ্টে রমাকান্তর মুখ থেকে শব্দ বেরিয়ে এলো, টিমটিম মা, তুমি এসেছো ?

--হ্যাঁ বাবা আমি এসেছি--আমি ভালো আছি--তুমি মন খারাপ করো না বাবা !

রমাকান্ত মধ্যে কেমন একটা ঘোর ঘোর ভাব চলছিল। স্বপ্ন বাস্তব সব যেন তার মনের মধ্যে গুলিয়ে যাচ্ছিল। তিনি হাত বাড়ালেন, মেয়ের মাথায় হাত ছোঁয়ালেন, হ্যাঁ স্পষ্ট অনুভব হচ্ছে, এ যে সত্যি টিমটিম ! টিমটিম এসে রমাকান্তর কোলে বসলো, খিলখিল করে হেসে উঠলো।

মাত্র কয়েক মিনিট হবে রমাকান্ত দেখলেন, নেই, টিমটিম নেই, টুং টুং টুং, শব্দ তাঁর কানে এলো। তিনি দেখলেন, সেই নেমে আসা তারাটা ধীরে ধীরে আকাশে উঠে যাচ্ছে। আকাশ কেমন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেছে।

রমাকান্ত ঘরে ফিরে এলেন। মেয়েকে ফিরে না পেলেও তার এ অস্তিত্বটুকুর ছোঁয়া তাঁর কিছুটা দুঃখ যেন ভুলিয়ে দিল। তিনি রোজ গভীর রাতে দীঘির পারে এসে বসেন। প্রতিদিন টুং টাং শব্দ করে আকাশ থেকে একটা তারা নেমে আসে, আর সেই তারার মধ্যে থেকে টিমটিম নেমে আসে। সে হাসে, খিলখিল করে হাসে, বাবাকে জড়িয়ে ধরে, তাঁর কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকে। তারপর যাওয়ার আগে বলে যায়, মাকে বলো, আমি আছি, তোমাদের পাশেই আমি থাকি, আকাশের তারা হয়ে তোমাদের দেখতে পাই, মাকে কাঁদতে না করো, বাবা !

এমনি ভাবে বেশ কিছু দিন কেটে গেল। হঠাৎ একদিন টিমটিম এল না, আর এলো না। রোজ রমাকান্ত দীঘির ঘাটে এসে বসে থাকেন। আকাশের দিকে, তারাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন, কিন্তু না, টিমটিম আর আসে না।

রমাকান্ত ভাবলেন, আর দীঘির ঘাটে তিনি আসবেন না। তিনি নির্নিমেষ আকাশের তারাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখ থেকে তাঁর দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই টুং টাং শব্দটা তার কানে ভেসে আসে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আকাশের দিকে তাকান, একটা তারা ধীরে ধীরে নেমে আসছে, টুং টাং মিষ্টির শব্দের তালে তালে। এই তো তাঁর মেয়ে,  এখন এসে হাজির হবে, কিন্তু না, এ ত টিমটিম নয়, তবে ?

--মেসো, আমি টিমটিমের বন্ধু, রোজ তোমাকে  বসে থাকতে দেখি। 

-- টিমটিম কোথায় ? সে আসছে না কেন? 

--সে তো নতুন জন্ম নেবে বলে চলে গেছে। 

--আর তাকে দেখতে পাব না? 

--হ্যাঁ পাবে তো--টিমটিম তো তার নিজের বোন হয়ে জন্ম নেবে। 

এদিকে রমাকান্তর স্ত্রী দশ মাস পরে এক ফুটফুটে মেয়ের জন্ম দিলেন। রমাকান্ত নব জাতিকার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন, এ যে সেই, অবিকল সেই টিমটিম, আবার ফিরে এসেছে তাঁদের ঘরে।

সমাপ্ত


No comments:

Post a Comment

সম্পাদকীয়--

সম্পাদকীয়-- অজানার মাঝে রহস্যময়তা লুকিয়ে থাকে। জন্ম-মৃত্যু বুঝি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড়  রহস্য। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আমরা অভ্যস্ত, অভ...