তলাশ
প্রেরণা বড়াল
আমরা তখন দিল্লিতে থাকতাম।
আমাদের বন্ধুদের একটা ছোট্ট গ্রুপ ছিল এবং গ্রুপের সবাই ছিল ভ্রমণ বিলাসী । সেবার আমরা ছয় পরিবারের প্রায় দশজনের মত বেরিয়ে পড়লাম উত্তরাখন্ড ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে। আমি আমার সহপাঠী মঞ্জু এবং আরো দুই বন্ধু দর্শনীয় স্থান ঘুরতে ভাল বাসি। ধর্মের প্রতি আমার অতটা বিশ্বাস নেই। কারণ দেখা যায় মানুষ ধর্ম নিয়েই মারামরি হানাহানি বেশি করে।কিন্ত আমাদের ভিতর বেশিরভাগই ধর্ম ভীরু। তাই ঠিক হল যতটা সম্ভব ধর্ম স্থলের সাথে সাথে দর্শনীয় স্থান গুলো ঘুরে দেখার।
যথা সময়ে আমারা সবাই বেরিয়ে পড়লাম। দিল্লি থেকে হরিদ্বার আর ওখান থেকে দেহরাদুন (দেরাদুন)ঘুরে ট্যাক্সি নিয়ে মনের আনন্দ মুসৌরি পৌছালাম সবাই।বেশ ঘুরলাম। মুসৌরি ঘুরে ফেরার পথে আমার শরীর কেমন ম্যাজম্যাজ করতে লাগল।ঋষিকেশে এসে আমার দুবার বমি হল।আমার জন্য অন্য সকলে চিন্তিত। অন্যদের অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে- তারা ভাল করে ঘুরতে পারছেনা ভেবে আমার আরও খারাপ লাগছিল।দেবপ্রয়াগে এসে আমরা যে হোটেলে উঠেছিলাম তার অল্প দূরেই সঙ্গম স্থল। প্লান ছিল রাত ওখানে কাটিয়ে ভোরে সঙ্গম দেখেই আমারা বেরিয়ে পড়ব।কিন্ত আমার বেশ জ্বর হল। আমার শরীরের অবস্থা দেখে সবাই সিদ্ধান্ত নিল যে আমি যতক্ষণ না ভাল হচ্ছি ওখান থেকে ওরা কোথাও যাবে না। আমি সবাইকে খুব করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম ওদের ঘোরা জারি রাখার জন্য, আমার জন্য চিন্তা না করতে কিন্ত কোন কাজ হল না।
অভ্যাস বসত টুকটাক ঔষধ আমি সব সময় কাছে রাখি।তাই শরীরের অবস্থা বুঝে আমি ঔষধ খেয়ে নিয়েছিলাম। বমি কমে গেলে ও জ্বরটা কমল না। মঞ্জু হোটেল থেকে বরফ জোগাড় করে আমার শরীরের তাপ কমানোর চেষ্টা করল।একটু কম হল ও বটে। আমার অনুরোধে ওরা শুতে গেল। কিন্ত রাত দুটো নাগাদ আমার আবার জ্বর এল ।সাথে যেমন মাথা যন্ত্রণা তেমনই হাত পা ব্যথা। মনে হচ্ছিল বুঝি শেষ সময় আগত। তখন কাউকে খুঁজে চলেছিল মন।যে কাছে এলে,কথা বললে যার পরশে শান্তি পাব। যাকে কিছু না বললেও মনের সব কথা বুঝতে পারবে এমনই একজন হয়ত।
হ্যা, এমনই একটা পরশ পেলাম আমি। আমি চোখ খুললাম।চেয়ে রইলাম অপলকে। শান্ত,সৌম্য, একটা উজ্বল দিব্য মুখমন্ডল। সাদা শাড়ি পরা কপালে একটা চন্দনের টিপ,একরাশ ভিজেচুল গড়িয়ে পড়েছে।আমার কপালে তার কোমল হাত ছোঁয়াল" বলল কিরে শুয়ে রইলে চলবে?ঘুরতে এসে সবটা না ঘুরে দেখলে কি চলে,তবে ধার্মিক স্থানে বিশ্বাস রেখে ঘুরতে হয়।এবার ওঠ।"
মঞ্জুর আওয়াজ পেয়ে দরজার দিকে তাকালাম। ওকে বললাম "দরজা খোলা আছে ভেতরে এস।"ও জিজ্ঞেস করল কেমন আছি ।আমি তখন খুবই সুস্থ বোধ করছিলাম। মনে হল জ্বর আর নাই। আমার ভাল খবর দেওয়ার সাথে সাথে যখন আগন্তুকের সঙ্গে পরিচয় করাব মনে করে ফিরে তাকালাম তখন দেখলাম আমার বিছানার পাশে তো কেহই নাই। আশ্চর্য তিনি তো এখানেই ছিলেন। মুহূর্তেই কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। একথা কখনও কাউকে বলিনি। বললেও কেহ বিশ্বাস করবে না জানি।তার পর আর আমার জ্বর আসে নাই। আমি একদম সুস্থ শরীরে সবার সাথেই কেদারনাথ, বদ্রিনাথ ,আদি বদ্রি রানিখেত নৈনিতাল হয়ে দিল্লি ফিরে আসি।তবে জানিনা কেন মনের ভিতর একটা তলাস চলতেই থাকল। কেন জানি মনে হতে লাগল, কখন না কখন আমি তার দেখা নিশ্চয়ই পাব।


No comments:
Post a Comment