Saturday, 4 September 2021

ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়--আত্মার শান্তি

 



আত্মার শান্তি

ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়


ঠাকুর্দা শমিতকে খুব ভালবাসত। সেই দাদু মারা গেল বছর দুয়েক আগে। প্রায় বিরানব্বই বছর বয়েসে। শেষ জীবনে খুব কষ্ট পেয়েছিল দাদু। বার্ধক্যের কষ্ট যাকে বলে। কষ্ট তো হবেই। যাই হোক মারা যাওয়ার পর সব কষ্টের অবসান। সকলেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

কাকার একমাত্র ছেলে সুরথ আজ তিন বছর ধরে এক জটিল রোগে ভুগছে। কাকা কিন্তু এখানে থাকে না। ঠাকুর্দা বেঁচে থাকা কালীন এই রোগের সূত্রপাত। তিনি খুব খোঁজ করতেন সুরথের। বলতেন, দাদুভাই সুরথ কেমন আছে? বড্ড ভুগছে ছেলেটা।

-ভালই আছে। বলে কাটিয়ে দিত শমিত। আসলে ছেলেটাকে শমিতের বাবাও পছন্দ করত না। শুধু বাবা কেন তাদের সংসারের কেউ নয়। বড্ড ডেঁপো ছেলে। পড়াশোনা করত না আর বাপের পয়সা মদ খেয়ে উড়িয়ে দিত। এই বয়েসেই লিভার সিরোসিস হয়ে মরণাপন্ন। শমিতের কাকার আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল নয়। কিন্তু শমিতের বাবাও অর্থ সাহায্য করতেন না। বলতেন, ভষ্মে ঘি ঢালার পয়সা আমার নেই। 

দিনের পর দিন তার খোঁজ করত দাদু। বিরক্ত হয়ে শমিতকে একদিন আসল কথাটা বলতেই হল। দাদুর চোখ দিয়ে হুড় হুড় করে জলে বেরিয়ে আসত। বলতেন, ওরে সেও যে আমার আর এক দাদুভাই। সেও যে এই বংশের সন্তান।

আজ দুবছর হল দাদু নেই। এদিকে সুরথের অবস্থা উত্তরোত্তর খারাপের দিকে। তার চিকিৎসার অনেক খরচ। একদিন শমিতের কাকিমা এসেছিল। কিন্তু শমিতের বাবা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, অমন কুলাঙ্গার ছেলের মরণই ভাল।

রোজ রাতে একবার করে বাথরুমে যাওয়া অভ্যাস শমিতের। সেদিন বাথরুম থেকে ফেরার পথে দেখল বারান্দায় কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। চোর নাকি?

-কে? বলে চেঁচাল শমিত। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে আলো জ্বালতেই অমনি ভ্যানিশ। পরপর বেশ কয়েকদিন।

সাতদিন পরে সুরথের মা আবার ছুটে এল আকুল হয়ে। ছেলেটার বড় খারাপ অবস্থা। অনেক টাকা লাগবে। বাবা রেগে গিয়ে বলে দিল পরের দিন এলে আর দরজাই খোলা হবে না।

আজ গভীর রাতে বাথরুম থেকে ফেরার পথে আবার সেই ছায়ামূর্তিটাকে আবার দেখতে পেল শমিত। এবার খুব স্পষ্ট। একেবারে দাদুর মত।

-দাদু! বলে ছুটে যেতেই ছায়ামূর্তিও অদৃশ্য হয়ে গেল।

-এ খুব অকল্যাণের কথা। বাবা বললেন, তোর দাদুর আত্মা শান্তি পায় নি। একটা ব্যবস্থা তো করতেই হবে।

পন্ডিতদের তরফ থেকে শান্তি স্বস্ত্যয়ন আর যজ্ঞ করার পরামর্শ এল। আর গয়ায় গিয়ে পিন্ড দিতে হবে। ভাল করে করতে গেলে অন্তত লাখ দুয়েক তো লাগবেই। ওনার আত্মা চিরতরে শান্তি পেয়ে চলে যাবে। আর দেখা দেবে না কখনও।

বাবা তো রাজি। যে করেই হোক বাবার আত্মার শান্তি চাই।

সেদিন গভীর রাতে আবার শমিতকে দেখা দিল সেই ছায়ামূর্তি। আশ্চর্য আলো জ্বালতেও আজ আর মিলিয়ে গেল না। শমিত দেখল ওনার চোখ দিয়ে দরদর করে জল গড়িয়ে পড়ছে।

-দাদু! তুমি কষ্ট পেয়ো না। তোমার আত্মার শান্তির জন্যে বাবা দুই আড়াই লাখ খরচ করে যজ্ঞ করবে। আর গয়ায় গিয়ে পিন্ডদানের ব্যবস্থাও হয়েছে।

মাথা নাড়ল দাদুর ছায়ামূর্তি।

-দরকার নেই? কেন বলছ দাদু এ কথা?

-এই টাকা আমার সুরথ দাদুভাইয়ের চিকিৎসায় খরচ করতে বল। ছেলেটা হয়ত বেঁচে যাবে।

শমিত বলার চেষ্টা করল, কিন্তু দাদু তোমার আত্মা-

-শান্তি পাবে রে দাদুভাই। দেখবি আমি ঠিক শান্তি পাব। আর কখনও কোনোদিন আমি আসব না।

শমিতের জেদে বাবাকে রাজি হতে হয়েছে। সুরথের চিকিৎসায় দু’লাখ টাকা দিয়েছেন। আর পঞ্চাশ হাজার টাকায় সামান্য ক্রিয়াকর্ম করেছেন নিজের বাবার জন্যে।

অবশেষে সুরথ বেঁচে ফিরেছে। দাদুর আত্মা আর কোনোদিন কখনো শমিতকে দেখা দেয় নি।

 

mob- 8017413028/ 9339639108

W.A. 8017413028

Email chattopadhyayarun@gmail.com



No comments:

Post a Comment

সম্পাদকীয়--

সম্পাদকীয়-- অজানার মাঝে রহস্যময়তা লুকিয়ে থাকে। জন্ম-মৃত্যু বুঝি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড়  রহস্য। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আমরা অভ্যস্ত, অভ...