সাবিত্রী দাসের গল্প--
ওরা থাকে ওপারে
ওরা তো ওপারেই থাকে!আমাদের ইহলৌকিক সুখ দুঃখের যে জগৎ,তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা সেই জগৎ।অন্তত এই জগতের লোকেদের সেরকমই ধারণা। আর সেই অজানা জগৎ সম্পর্কে অপার কৌতূহলও তাই স্বাভাবিক।সেই তেনারা যখন কোথাও অবস্থান করেন সেটা অনুভূতি দিয়ে বুঝতে হয়। বোঝাও যায়।কোনো ঘরের একটি কোণের দিক সর্বদা অন্য জায়গার থেকে ঠান্ডা মনে হয় ।হঠাৎ করে ঘাড়ের উপর ঠান্ডা নিঃশ্বাস পড়া,এসবই ঘটে থাকে।
একবার ছোটো পিসীমার বাড়িতে শুনলাম অস্বাভাবিক সব ঘটনা ঘটছে।কৌতূহল বাধা মানলো না। দারুন এক রোমাঞ্চকর অনুভূতির আশায় ,সোজা ছোটো পিসীমার বাড়ি। পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে গেল।
রাতের খাবারের পর দোতলায় গেলাম শুতে। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল ,দু চোখের পাতাও ক্রমশ জুড়ে আসছে.......
-কেউ যেন মৃদু স্বরে ডাকছে।শুনছো! বললাম-"কে তুমি?কি বলছো ?"
-তুমি এখানে যার কথা শুনে এসেছো,তাকে নিতে এসেছি।ভারী বোকা! দেখো না বার বার চলে আসে।
- কেন কেন ,চলে আসে কেন?
-আরে কেউ কেউ মারা যাবার পরেও বুঝতে পারে না যে আগের জগৎ টা আর তার জন্য নেই,তাই অতো আরামের জায়গা ছেড়ে সে আবার চলে আসে ।
-সে জায়গাটা কেমন?
--চলো না,নিজের চোখেই দেখে নেবে । বুঝবে তোমরা কত কম জানো আমাদের বিষয়ে!
-চলো দেখবে তো! এই বলে আমার হাত ধরে
আমাকে টেনে নিয়ে শূন্যে একটা ঝাঁপ দিলো।দেখি হালকা মিষ্টি আলোয় ভরা কতকগুলো স্তর, সব বড়ো বড়ো তাকের মতো , যে যেমন কাজ করে সে সেরকম স্তরে থাকে।জায়গাটা কুয়াশার মতো আর গুঁড়ো বরফের পাতলা মসৃন আস্তরনে ঢাকা,খুব আরামের !কি শান্তি!কত সেবা যত্ন ,শুশ্রুষা!কি বলবো! সবাই কত হাসি খুশি আর আরামে রয়েছে।হালকা অর্ধ স্বচ্ছ সব শরীরগুলো।আমাদের জগতের কত নিপীড়ন ,যন্ত্রনা,কত মনোবেদনা!দিন রাত শুধু অন্যের মন জুগিয়ে চলার অভিনয়,এসবে ক্লান্ত আমি তো মুগ্ধ হয়ে গেলাম ! না এখানেই রয়ে যাবো আর ফিরে যাব না!বেশ লাগছে এখন !আঃ কি আরাম !
ভাবতে ভাবতে বোধ হয় একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম,ব্যস পিছলে পড়ে গেলাম। একি, পড়ছি তো পড়ছিই! ধপাস করে ,বিছানায়! কি হলো, বুঝলাম নাতো!স্বপ্ন দেখলাম নাকি! তাহলে গায়ে এই সাদা কুযাশার মতো কি! এগুলো এলো কোথা থেকে ?
২
কার মুখ
ওফ্ঃ প্রতিদিন সেইএক কথা! কাঁহাতক আর ভালো লাগে। বলতে গেলে বাড়ীটা পেয়েছিল একেবারে জলের দরে। এ বাজারে বাড়ী যোগাড় করতেই হিমশিম খায় লোকে, তার উপর দামের ব্যাপারটাও! মাথায় কিছু থাকলে তো! হিংসে করেই যে লোকে বাড়িটার দোষের কথা রটাচ্ছে ,এই কথাটা কিছুতেই রীতিকে বোঝাতে পারলো না।
অফিসে থাকতেই আজ আবার ফোন করেছে, 'ভয় করছে!' 'উফ! জ্বালিয়ে মারলো দেখছি, অফিসটাও শান্তিতে করতে দেবে না!'
সত্যিই কাজ না থাকলে যা হয়! কতবার বলেছে 'এসব তোমার মনের ভুল।' শুনলে তো! প্রতিবেশীদের কথা গুলোই ঘুরছে মাথায়, কেবলই বলে, 'মনে হয় কেউ যেন আমার সাথে সাথেই ঘুরে বেড়াচ্ছে সবসময়।' ফোন বাজছে, বাজুক, বেজে যাক
ধরবে না, কিছুতেই ফোন ধরবে না সুমন! কাজের সময় জ্বালাতন কাঁহাতক ভালো লাগে! সবকিছুরই সীমা আছে একটা।
রীতি বুঝুক এভাবে বারবার ফোন করে বিরক্ত করা অন্যায়।
তিন চার বার রীতির ফোন এলেও ধরলো না সুমন। তখন রাগ করে ফোন না ধরলে কী হবে, পরে ওর মনটা বেশ খারাপ লাগছিল ।রীতির কথা ভেবেই অফিস ছুটির পর একটুও দেরী না করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লো । খেতে ভালোবাসে রীতি,বাস থেকে নেমেই গরম গরম মাংসের চপ কিনল। হেমন্তের বেলা! বাড়ী পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল ।
ঠেলতেই বাইরের দরজাটা খুলে গেল, কী আশ্চর্য! একা একা আছে, দরজাটা বন্ধ করেনি পর্যন্ত ।
এমন তো কোনদিন করে না! ফোন ধরেনি বলেই রাগ করেছে বোধহয়। হাতের ব্যাগটা নামিয়ে, চপের ঠোঙা হাতেই রীতির খোঁজে রান্না ঘরে, সেখানে না দেখতে পেয়ে সোজা একেবারে বেডরুমের দরজায়। ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। পিছন ফিরে থাকায় সুমনকে দেখতে পায়নি। একেবারে কিস্তিমাত করবে মাংসের চপ খাইয়ে, রীতি খুব জোর রেগে আছে মনে হচ্ছে । সব রাগ জল হতে বেশী সময় লাগবে না। এগিয়ে এসে দাঁড়ায়, এ কী দেখছে সুমন, আয়নায় ও কার মুখ ! ন্যাড়া মাথা ,মুখের মধ্যে এখানে সেখানে রক্তের ছোপ। কী বীভৎস! রীতি কী ওকে দেখতে পাচ্ছে না! ওর দিকে তাকিয়ে চমকে গেল সুমন, রীতি আয়নার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ালে কী হবে।মাথার পিছনে চুলের ফাঁক দিয়ে ওটা কার মুখ! কেঁপে উঠল সুমন, চপের ঠোঙাটা পড়ে গেল হাত থেকে।


No comments:
Post a Comment