অন্য পারে...
..................
শ্যামাপ্রসাদ সরকার।
চাঁদু'র মা সবার রাতের খাওয়া দাওয়া ঘুচলে এতক্ষণে উনুন নিভিয়ে, বাসনকোসন সব ধুয়ে, তারপর হেঁসেল বন্ধ করে এসে শোওয়ার ঘরের সামনের দূয়ারের কাছটায় পা'দুটো ছড়িয়ে দিয়ে এবার একটু জিরোতে বসলেন। হাঁপ জিরোতে চাইলেই কি আর মেলে? কর্তাকে গাঁয়ে মান্যগণ্যি করে লোকে হরি ডাক্তার বলে ডাকে। তিনি রুগী দেখে এখনো ফেরেন নি। আর কখন যে ফিরবেন তাই বা কে জানে? খোড়কোল নামের গ্রামখানা যদিও বেশীদূরের নয় তাও লকাই মন্ডলের বউ পেট ব্যথায় সেই সকাল থেকে ছটফট করতে এখন মুর্ছা গেছে বলে লকাই একটু আগে ডাকতে এল বলে তিনি কলে বেরোবেন বলে ডিসপেন্সারীতে তালা ঝোলালেন। এ অবস্থায় তো ছেড়ে আসাও যায়না, অগত্যা!
যদিও দেশ- গ্রামে একটু সন্ধ্যে গড়াতেই ঝুপসি অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। তার ওপর কাল আবার অমাবস্যা গেছে। চারদিক এই নটা সাড়ে নটা'তেই মাঝরাতের মতো ঝিমিয়ে আছে। এই পরিবারটির তিন ছেলের একজন নিরুদ্দেশ আর অন্যজন খামখেয়ালী ও ভবঘুরে। কনিষ্ঠটি এখন সবেমাত্র ম্যাট্রিক পাশ করে যুদ্ধের বাজারে পল্টনের কাজ যদি জোটে তার খোঁজে কলকাতায়। এছাড়া মেয়ে'দের মধ্যে দুজনে এখন নাবালিকাত্ব ছেড়ে আস্তে আস্তে যৌবনে পা রাখছে। এই সংসারের বড়টি আর মেজটি যদিও আগের পক্ষের তাও চাঁদু'র মা তাদেরকে একবারের জন্যেও কোনদিন যেমন বুঝতে দেননি তেমনই নিজেও সেটা ওদের থেকে পেয়েছেন।
বড়বৌমা তো ছেলের জন্ম দিতে গিয়ে আঁতুড়েই চলে যাবে তা আর কে জানত! আর সেই শোকে বড়ছেলেটিও আজ মাসাধিক কাল ধরে বিবাগী।
নেহাত কর্তা এখনো কোনওমতে ডাক্তারীটা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দু'বেলা শাকান্ন হলেও জুটছে।
........
পা ছড়িয়ে বসে থাকতে থাকতে ঢুলুনি এসে গেল। আর সেই সময় ঝুপসি গাবতলা থেকে একখানা হুতুম পেঁচা ডাক দিতে দিতে হঠাৎ উড়ে গেল।
" মা! দেখি এট্টু পা'দুখানিকে সরান তো! কোলের ছেলেটার দু'চোকে ঘুম দিয়ে আসি গে..."
এই অসময়ে মেয়েটা আবার কে? যদিও মুখ দেখা যাচ্ছেনা। তবে কোন বৌ মানুষ এল নাকি? আবার মাথাজোড়া বিরাট ঘোমটা! তবে গলাটাও যেন খুব চেনা চেনা!
এবারে হুঁশ ফিরতেই বুঝতে পারলেন,
" আরে! এতো বড় বৌমা'র গলা না? কিন্তু দু'মাস হল সে অভাগী তো......"
চকিতে ঘরে ঢুকে চাঁদু'র মা একবার ঘুমন্ত নাতির কাছে এগিয়ে গেলেন। তারপর গায়ে হাত দিয়েই চমকে উঠলেন।
.......
সবটা এখন বুঝতে পারলেও যে বড় দেরী হয়ে গেছে। বিদেহী হয়ে গিয়েও স্বস্তি ছিলনা বড় বৌমার। পেটের সন্তানকে ছেড়ে থাকার যন্ত্রণা তাকে ওপারে গিয়েও কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল এতদিন।
তাই এই জগতে ফিরে একবারের জন্য
" কোলের ছেলেটার দু'চোকে ঘুম দিয়ে আসি গে..." বলে তাকে ওপারে টেনে নিতেই সে আজ এসেছিল।
মশারীর ভেতরে এখন তার দু'মাসের সদ্যজাত শিশুটি রক্তশূন্য পান্ডুর মুখে মরে, কাঠ হয়ে ঘুমাচ্ছে।
..........


No comments:
Post a Comment