Monday, 6 September 2021

সন্ধ্যা রায়--দেবদর্শন



দেবদর্শন 

সন্ধ্যা রায় 


সেদিন ছিল লক্ষীপূজ। মা সকালের পূজা সারছে। রাতে আবার ভোগ নিবেদন করে পূজ হবে। এমন সময় হঠাৎ চোখ পড়ল বাইরে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন সাদা থান পড়নে এক বৃদ্ধা। আমি দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে বললাম - ঠাকুমা ভিতরে আস। উনি আমার সাথে এলেন। আমাদের একটা কাঠের চেয়ার ছিল তাতে বসতে দিলাম। বললাম, ঠাকুমা তুমি বস মা পূজ করে আসছে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম নিজের ঠাকুমাকে কোন দিন দেখিনি ওনাকে দেখে আমার ঠাকুমা বলেই মনে হল। আমরা সবাই চুপচাপ। মা আসতেই ঠাকুমা বললেন, বৌমা আমাকে একটা কলাপাতা দাও। মা পূজার জন্য কলাপাতা যা তোলা ছিল তার ভিতর ফুল, বেলপাতা, ধান, দূর্বা সব গুছিয়ে দিল। ঠাকুমা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে  বললেন - তোমার আলপনা খুব ভালো হয়েছে। 

মা বলল, মাসিমা রাতে আমি পূজ করব রাতে আসুন। ঠাকুমা আসবে বলে চলে গেলেন। 

ঠাকুমা প্রায়ই আসতেন। চা খেতেন আর আমাদের গল্প শোনাতেন। ওনার দেশের বাড়ির, দেশের মন্দির, ভুতের, গাছপালা, ক্ষেতখামার, নদী পাহাড় এমনকি মুসলমানদের অত্যাচার, সব বলতেন। ঠাকুমাদের অনেক জমি জায়গা ছিল। ঠাকুর দাদু সব ঘোড়ায় চড়ে দেখা শোনা করতেন। 

আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। উনি এক আশ্চর্য গল্প শোনালেন। আমরা সবাই চুপচাপ বসে। উনি বলে চলেছেন-- 

সকালে বাসি কাজ সেরে পাশেই একটা মন্দির, ওখানে গিয়ে তিনি প্রণাম করে আসতেন। মন খারাপ হলে একটু বেশি সময় বসতেন। নামজপ ও করতেন।

মন্দির থেকে একটু দূরে একটা শিশু গাছের নীচে বেদীতে তিনি বসতেন। রোজের মত একটা ছেলে ফুলের ঝুড়ি দিয়ে যায়। হারাধন ঠাকুর দালান ঝাড়ু পোছা দেয়। তেঁতুল আর ঘাস দিয়ে বাসন মেজে চকচকে করে। ঠাকুমা এসব রোজ দেখেন। 

পূজ এসে গেছে। সকালে আজ মহালয়া হয়েছে। চণ্ডী পাঠের পর সবাই চলে গেছে। কাছে পিঠে আজ আর কেউ নেই। 

আজ ঠাকুমা একা একা দূরে শিশু গাছের নীচে বেদীতে বসলেন। নাম করতে করতে সূর্য উঠে গেছে। ঠাকুমা মন্দিরে প্রণাম করতে গিয়ে সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় দাঁড়াতে দেখলেন, মা স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছে !

স্বয়ং মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঠাকমা মূর্ছা গেলেন। কতক্ষণ শুয়ে ছিলেন জানেন না। যখন জ্ঞান এল তখন শুনতে পাচ্ছেন মন্দিরের ঠাকুর মশাই জোরে জোরে ঘন্টা পিটিয়ে হাতে প্রদীপ নিয়ে আরতি করছেন। সেই শব্দে ঠাকুমা দূর্বল শরীরে উঠে বসলেন। উঠে কাঁদতে লাগলেন। 

ঠাকুর মশাই বললেন, মাসিমা কি হয়েছে ? আপনাকে কত ডাকলাম আপনি ওঠেননি, তাই আমি পূজটা সেরে নিলাম। 

ঠাকুমা কথার কোন উত্তর দিলেন না। উনি জানতেন - এসব আজ আর কেউ বিশ্বাস করবে না। উনি ধীরে ধীরে ঘরে গেলেন। ওখানেও সবাই বলল আজ এতো দেরি হল কেন ? তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন, না হলে পেটে পিত্ত পড়বে। ঠাকুমা এ সবের কোন জবাব না দিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেলেন। ওনার ভগবান দর্শন ওনার মনেই রয়ে গেছে। আজ পর্যন্ত কাউকে উনি সেই অলৌকিক ঘটনার কথা বলেননি।

সমাপ্ত

 

No comments:

Post a Comment

সম্পাদকীয়--

সম্পাদকীয়-- অজানার মাঝে রহস্যময়তা লুকিয়ে থাকে। জন্ম-মৃত্যু বুঝি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড়  রহস্য। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আমরা অভ্যস্ত, অভ...