Monday, 6 September 2021

মহুয়া বিশ্বাস--ভুতুড়ে কাণ্ড


ভুতুড়ে কাণ্ড

মহুয়া বিশ্বাস



একদিন বিকেলে  একটা বনের ভীতর দিয়ে বিশাল এক মাঠ-জঙ্গল পেরিয়ে দুই বন্ধু অসীম আর সুরেশ  মেলায় বেরিয়েছিল। সেখান থেকে ফেরার পথে  হাঁটতে হাঁটতে  মাঠের মাঝ বরাবর  বেশ একটু রাত হয়ে এলো। চারপাশ নিস্তব্ধ, গাঢ় কালো সূচাভেদ‍্য অন্ধকার ! পাশেই একটা নদী বয়ে যাচ্ছে নিরবে। জনমানসের কোনো সাড়াশব্দ নেই ! শুধু ঝিঁঝিঁর ডাক নিস্তব্ধ পরিবেশকে আরও  রহস‍্যময় করে তুলেছে! অসীমের হাতে একটা টর্চ। 

পথের ধারে বেশ খানিকটা বিস্তৃত জোড়া বাঁশ বাগান। গাছের মাথাগুলি ঝুঁকে পড়েছে একেবারে পথের উপর। দিনের বেলায় অন্ধকার নেমে আসে সেখানে। ঐ বিশাল বাঁশবাগানে পাশের গাঁয়ের বাঞ্ছাখুড়ো গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত‍্যা করেছিল।

ছোটো থেকে অসীম ও সুরেশ ঐ পথে যেতে গেলে ওদের বুক ধড়ফড় করতো। ঐ স্থানে নিঃস্বাস বন্ধ করে ওরা দৌড়াত। ওটা ওদের স্কুলে যাবার পথ ছিল। ভয়ে যেন হৃৎপিণ্ডের ধক্ ধক্ বন্ধ হবার উপক্রম হত। এক দিনের কথা মনে পড়ে অসীমের, দলবেঁধে  সব বাচ্চারা স্কুলে  যাচ্ছিল--ঐ গ্রামের  দুজন  রাখাল ছাগল  চড়াচ্ছিল। বাঁশবাগানের ভীতর। ঘাস, লতাপাতায়  আটকানো  ছিল বাঁশগাছের মধ‍্যভাগ পর্যন্ত। বাঁশগাছের সরু সরু শুকিয়ে থাকা শুকনো ডাল ভাঙবে বলে এক রাখাল বালক একটা বাঁশগাছে উঠতে লাগলো। গাছটি ছিল লতাপাতায় ঢাকা আর পাতাগুলো বেশ ঝুঁকে পড়েছে নীচের দিকে.....উপরের দিকে তাকানোর অবকাশ ছেলেটার ছিল না। আনমনে শুকনো ডাল ভাঙতে ভাঙতে গাছের আরও উপরে সে উঠে গেল। হঠাৎ তার মাথার ওপরের বারবার ঝুলন্ত ডালের মত একটা বাঁধাপ্রাপ্ত ডালকে ভেঙে ফেলার  জন‍্য  উপরের দিকে তাকাতেই তার সারা শরীর শিউরে উঠলো ! একটা মানুষের পা ঝুলছে তার ঠিক মাথার উপর !  সে চিৎকার করে বলল--'বাবা গো--বাঁচাও গো'---! ভূত ! ভূত ! ভুত ! সারা শরীর   তার ভয়ে অসাড় হয়ে এলো! সে গাছ থেকে নামবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। সে এতো মোটা ছিল যে বিক্ষিপ্ত বাঁশের ডালের ফাঁক  থেকে শরীরকে বের করে আনতে পারছিল না। তার ভুঁড়ি  ছোটো ছোটো কুঞ্চিতে বেঁধে গেল। এই দেখে ভয়ে তার  রাখাল সাথী  ঊর্ধশ্বাসে পলায়ণ করলো গ্রামের দিকে। ভয়ঙ্কর পরিবেশে নিজেকে বাঁচাতে ব‍্যাস্ত  অসহায় বালকটি  কাঁদতে কাঁদতে বলল--'ওরে আমাকে ছেড়ে যাস নে..আমার ভুঁড়ি বেঁধে গেছে..আমাকে বাঁচা..এখান  থেকে উদ্ধার কর !' 

স্বার্থপরের মত নিচের রাখাল বালক পলায়ণ করলো। গ্রামে পৌঁছে সে লোকজনকে জানালে..তারা সে স্থানে এসে হাজির হল--এবং এই ভাবে ঐ অসহায় রাখাল  নিস্তেজ শরীরে প্রাণ ফিরে পেল। 

আজ নির্জন অন্ধকার রাতে ঐ স্থানে এসে শৈশবের সে সব কথা মনে পড়তেই  অসীমের গা ছম্ ছম্ করে উঠলো। মনে করতে করতেই সে দেখলো, হঠাৎই সুরেশের সামনে একটা লম্বা বাঁশ কট্ কট্ আওয়াজে রাস্তার উপর আড়াআড়ি ভাবে নুইয়ে পড়লো। চমকে উঠলো দুই বন্ধু।

সুরেশ সামনে ছিল। চারপাশ ঘন জঙ্গল--কোনো রাস্তা নেই ! পথ একটাই। সুরেশ সিদ্ধান্ত নিল বাঁশটির উপর দিয়ে ডিঙিয়ে যাবে বলে। অসীমের ভরসা হচ্ছিল না..মনটা খট্ খট্ করছিল।

অসীম বলল--না..ঠিক হবে না! সুরেশ উত্তরে বলে উঠলো..তবে কি  এই বাঁশের অপেক্ষায় সারারাত  এখানে কাটিয়ে দেবো? কীংকর্তব‍্যবিমূঢ় অসীম স্তম্ভীত এই দৃশ‍্যে !  সুরেশ বাঁশটাকে টপকানোর জন‍্য এক পা ওপাশে দিতেই..সড়াৎ করে এক ঝটকায় নুইয়ে  থাকা বাঁশটি সচল হয়ে সুরেশকে তুলে নিয়ে উপড়ে উঠে গেল। অসীম থমকে বসে পড়লো। সুরেশকে ঐ বাঁশটি উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে ধড়াস করে ফেলেদিল মাটিতে ! সুরেশ অজ্ঞান হয়ে গেল ! অসহায় একলা...প্রাণে একদম জোর ছিল না অসীমের। সমস্ত শক্তি যেন নিংড়ে নিয়েছে এই রহস‍্যময় পরিস্থিতি ! অবশ শরীর আর ভয়ে অসাড় মন নিয়ে কোনো রকমে অচৈতন‍্য সুরেশকে নিয়ে টানতে টানতে  বাঁশবাগান পেরোলো সে। ঠাকুরের নাম করতে করতে....আবার একটা বিপদ  এসে হাজির না হয় এই আশঙ্কায় সে এগিয়ে গেলো ! গ্রামের নিকটবর্তী মাঠে এসে  উপস্থিত হল। হঠাৎ অসীম দেখতে পেলো  একটা আলো জ্বলছে  টিম টিম করে.. আলোটিকে লক্ষ‍্য করে  অসীম এগিয়ে গেল। দুটো মানুষের কথপোকথনের  মৃদু শব্দ শুনতে পেল সে ! গলার স্বর বসে গেছে.. চিৎকার করার ক্ষমতা হারিয়েছে সে। তারা একটা ছাউনীর নীচে বসেছিল..লোকদুটো  মেশিনের মাধ‍্যমে  সেচের জল দিচ্ছে জমিতে। সেখানে পৌঁছিয়ে ধরে প্রাণ এলো অসীমের। তারা কিছু জিজ্ঞাসার আগেই অচৈতন‍্য সুরেশকে দেখে ব‍্যাস্ত হয়ে পড়লো। মেশিনের জলের ছিঁটা  সুরেশের চোখে মুখে দিতেই  তার জ্ঞান ফিরে এলো। একটু সুস্থ  হলে ঐ ব‍্যাক্তিদের সাথে ওরা গ্রামে ফিরে গেল।

------------


No comments:

Post a Comment

সম্পাদকীয়--

সম্পাদকীয়-- অজানার মাঝে রহস্যময়তা লুকিয়ে থাকে। জন্ম-মৃত্যু বুঝি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড়  রহস্য। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আমরা অভ্যস্ত, অভ...