Monday, 6 September 2021

চারু মান্নান--নেংটি মেছোভূত





নেংটি মেছোভূত 

চারু মান্নান


শৈশব পেরিয়ে সবে পা দিয়েছে কৈশরে। সর্বত্র হাসা হাসি, ছুটে চলা, পুকুর পাড়ে, বাঁশঝাড়ে, কলতায়, ভূঁইয়ের আইল পথ ধরে। গায়ের এপাড়া ্ও পাড়া। বাপ দাদাদের চৌদ্দ পুরুষের বাস গ্রামের সব শেষে উত্তর পাড়ার শেষ ভিটাটি। রিমলিদের বাড়ি। 

বাড়ির পুব পাশে খোলা উঠান। উঠানের পুবে পাগারের ধারে বয়সি সজনে গাছ। তার দক্ষিণে কোনায় একটা তাল গাছ। তার পাশে একটা খেজুর গাছ। দক্ষিণ পাশে বেশ বড় একটি বড়ই(কুল)গাছ। পশ্চিম পাশে কলতলা, কলতলার ধার ঘিসে আতা গাছ। তার পাশেই উনুন ঘর। খরের চাল দেয়া। চালের উপর কুমরা গাছ ছেয়ে আছে। মাঝে মাঝে কুমড়া, সাদা চুনের গা। উত্তর পশ্চিম কোনায় বাঁশঝাড়। তার গা ঘিঁসে একটি খকসার গাছ। বাঁশঝাড় পেরিয়ে একটা বদ্ধ পকুর। আর এর মাঝখানেই চার পাঁচটা মাটির দেয়াল দেয়া ঘর। এখানেই রিমলিরা থাকে। রিমলিরা চার পাঁচ জন ভাই বোন, চাচা, জেঠুদের নিয়ে। পুকুরের চার পাশ গাছ গাছালিতে ভরা। ঐ পুকুরের পশ্চিম পাড়ে মস্ত বড় এক তেঁতুল গাছ। তার পাশেই আবার একখান বটগাছ তার ঝুড়িতে ভরা, তার শিকড়ে বসত নানা পাবণের মেলা। বট গাছ তার তেঁতুল গাছের গড়ায় ছিল বেশ পুরনো শিবের পাথর। মিথ আছে, ঐ পাথর কেউ যদি দূরে সরে নিয়ে যায়, তা কোন এক সময় আবার তার জায়গায় ফিরে আসে। এর উত্তর পাশে আবার একখান চিকন খাল বয়ে গেছে, বষায় কুচুরি পানায় ভরে যায়। কচুরি পানার ফুল তুলে রিমলি।

এমনি কিশোড়ী রিমলি, রাতের তার দাদীর সাথেই ঘুমায়। দাদী তার নাতনীদের মাঝে রিমলিকেই বেশী আদর করে, রিমল্ওি কম যায় না, দাদি ছাড়া কিছুই বুঝে না। দাদির গোলা জড়িয়ে প্রতি রাতে ঘুমায়। আর প্রতি রাতে, একটা না একটা গল্প শোনেই। তা না হলে, রিমলির না কি ঘুমই আসে না। আজ রিমলির বায়না, একখান ভুতের গল্প শুনবে। দাদি, তো ভুতের গল্প বলতেই চায় না, কারন বাড়ির চার পাশে জঙ্গল, তার নাতিরা যদি ভয় পায়। কিন্তু রিমলির বায়না, ভুতের গল্প তাকে না কি শোনাতেই হবে। এ দিকে রাত বাড়তে থাকে রিমলি তো ঘুমায় না। দাদি যতই বলে, এই এখন গভির রাত, অন্ধকার থমমে। এখন ভুতের গল্প শোনলে ভয় পাবি রিমলি, আজ ঘুমা আমার ঘুম পাচ্ছে, ধমকের শুরে বলে উর দাদি মা। কে শোনে কার কথা। দাদিকে পাশ ফেরায়, না দাদি গপ্প না শুনলে আমি ছাড়ছি না।

তা’হলে শোন! সে বার তোর দাদা, খালে গেল মাছ ধরতে, সবে সন্ধ্যে আঁধার। খালে নতুন আষাঢ়ে ঢলের জল, রিম ঝির বৃষ্টি পড়ছে। ঘোর আঁধার আকাশে কালো মেঘ। বিজলী চমকায়। আমি তোর দাদার জন্য উঠানের পাশে বাড়ান্দায় বসে। তোর দাদা খালে ঝাঁকি জাল ফেলছে, আর জাল ভর্তি মাছ উঠছে, এমনি করে জাল ফেলছে আর মাছ ধরছে। খলই ভরা মাছ। তোর দাদা, পিছনে মাছ রেখে যেই জাল ফেলতে পানিতে যায়, আবার জাল ভরে গেছে মাছ, টেনে তুলে খলয়ের কাছে যায়, দ্যাখে খলয়ে একটা মাছ্ও নাই। আবার খলই ভরে জাল ফেলতে যায়। মাছ ভর্তি জাল নিয়ে যেই খলয়ের কাছে আসে দ্যাখে মাছ নাই। এমনি বিজলী চমকানো রাত, মাঝে মাঝে বাজ পড়ে, আর তোর দাদার মনে ভয় ডুকে যায়, দ্যাখে তোর দাদার চার পাশে কারা যেন ঘুরাঘুরি করছে। এদিকে খলয়ে মাছ নাই, জাল ফেললেই জাল ভর্তি মাছ। তোর দাদাকে মাছের নেশায় পেয়ে বসে। এদিকে রাত গভির হতে থাকে। তোর দাদা বাড়ীতে ফিরে না। ক্উাকে যে খালের ধারে পাঠাবে, তেমন কেউ নাই বাড়িতে। আমি তো চিন্তায় সারা। তো দাদা তো মাছ ধরছে তো ধরছেই। তোর দাদাকে একদল মেছোভুত জেঁকে ধরেছে, তোর দাদা মাছ মাড়ে আর মেছো ভূতেরা লুটে পুটে খায়, খালের চার পাশ মাছের আঁশটে গন্ধে ভরে উঠে। তখন তোর দাদার হুশ ফিরে আসে, ভোর আঁধারে। একটা নেংটি মেছোভূত খালি খলইটা তোর দাদার গায়ে ছুঁড়ে মেড়ে, মেছো ভূতের দল পালিয়ে ঐ বট গাছ টায় যায়।

===============

 

No comments:

Post a Comment

সম্পাদকীয়--

সম্পাদকীয়-- অজানার মাঝে রহস্যময়তা লুকিয়ে থাকে। জন্ম-মৃত্যু বুঝি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড়  রহস্য। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আমরা অভ্যস্ত, অভ...