সত্যি কি কেউ ছিল?
কৌস্তুভ দে সরকার
"দ্যাখোতো, কে যেন মনে হল চলে গেল..."
আজকাল নমিতার এরকমই মনে হচ্ছে কেন যেন। সন্ধ্যায় দোতলার ঘরে বিছানায় বসে টিভি দেখে ওরা, বাবান পড়তে যায় তখন। অরূপ আর ও সেসময় চা খেয়ে, টিভি দেখে, একসাথে কিছুটা সময় কাটায়। সামনের দরজাটা খোলাই থাকে। সামনের দরজায় সাদা পর্দা ঝুলতে থাকে। আর দরজার সামনেই সিঁড়ি। নমিতার মনে হয়, কে যেন এক ঝটকায় দরজার সামনে দিয়ে চলে গেল। উঠে যে গিয়ে দেখবে, তাতেও ভয় ওর । অরূপকেই বলে, "যাওনা, গিয়ে দেখে আসোনা একটু।" অরূপ বলে, "আরে ইঁদুর টিদুর হবে বোধহয়। তাছাড়া পাশের বাড়ির বেড়ালটাও আসে, ওটাই হবে হয়তো!" নমিতা জিদ ধরে বসে থাকে। অগত্যা, অরূপ যায়। গিয়ে দেখে ঘুরে এসে বলে, "কই কিছু নাই তো। কেউ না। ওটা তোমার ভ্রম।" নমিতা কিছুটা আশ্বস্ত হয়। আবার মনে মনে কিছুটা ভয়ও পায়। বুঝতে পারেনা, এটা ওর নার্ভের দুর্বলতা নাকি অন্য কিছু। এত বড় বাড়ি ওদের, বড় বড় জানলা, কতরকম হাওয়া-বাতাস আসে, আসতেই পারে। ভেতরে অনেক গাছ, টবে, বারান্দায়। সেগুলোর ছায়াও প্রতিফলিত হতে পারে। তা সত্বেও কেন যেন ওর মনে হয়, ঘরে কেউ, কিছু একটা ঘোরাঘুরি করে। নমিতার কাছে পাড়ার কিছু মেয়ে সেলাই শিখতে আসে। ওরাও ওকে বলেছিল একদিন, "ম্যাম, আপনার বাড়িতে কি আর কেউ থাকে?" নমিতা বলে, "কেন বলতো?" ওরা বলে, "কেন যেন মাঝেমধ্যে মনে হয়, কে যেন চলে গেল দরজার সামনে দিয়ে।" ওরাও ভয় পায়। তবে কোনোদিন কোনোরকম ক্ষতি না হওয়ায় নমিতা মনকে কখনো আবার এই বলেও সান্ত্বনা দেয়, নিশ্চই কোনো ভাল আত্মা। হতে পারে তার শ্বশুরমশায়। এখানে উনার ছেলে, বৌমা আর নাতিকে পাহারা দিতে আসে। গোটা বাড়িটাই দেখে রাখে ওদের। হয়তো এটাই ঠিক। কেননা, সেদিন সামনের বাড়ির দাদা গল্পে গল্পে জানতে চেয়েছিলেন, "আচ্ছা, শ্রাবণী পূর্ণিমার সন্ধ্যায় সারা বাড়িতে কি আপনারা প্রদীপের আলো দেখান?" "কেন বলেন তো?" নমিতা অবাকই হয়। আরে সেদিন সন্ধ্যায় তো ওরা তিনজনেই মলে গিয়েছিল, একটু এটা-সেটা কেনার জন্যে, আর একটু ঘুরে বেড়াতে - পূর্ণিমায়। সন্ধ্যায় তো সেদিন ওরা ঘরে কেউই ছিল না। তাহলে বাতি দেখাচ্ছিল কে? সামনের বাড়ির দাদা বললেন, "আপনাদের জানলার কাঁচ দিয়ে আর সিঁড়িঘরের কাঁচ দিয়ে দেখলাম, মনে হল, বাতি নিয়ে কে যেন সারা বাড়িতে আলো দেখাচ্ছে!" নমিতা ঠিক বুঝতে পারে, ব্যাপারটা কি।
বাড়ির ছাদে প্রচুর টব, নানারকম ফুল ও ফলের গাছ নমিতাদের। বাড়ির পোষ্যকে রোজ রাতে ডিনারের পর ছাদে ঘোরাতে নিয়ে যেতে হয়। এটাই রেওয়াজ। নমিতারও ভালো লাগে এটুকু সময়। তাছাড়া কথাতেই আছে, আফটার ডিনার ওয়াক এ মাইল। তবে, এরই মধ্যে সামনের বাড়ির কর্তা প্রয়াত হয়েছেন। পাড়ায় একটা শোকের আবহ চলছে। দুদিন হল, পোষ্যকে নিয়ে ছাদে উঠতেও ভয় পায় সে। শরীর ভারী হয়ে আসে নমিতার। কেন যেন মনে হয়, পেছনে কেউ ঘুরছে, ও ছাড়াও কেউ আছে ছাদে। নমিতার সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। গলা শুকিয়ে আসে। যত তাড়াতাড়ি পারে পোষ্যকে নিয়ে দৌড়ে নেমে আসে ছাদ থেকে। রাত্রে ঘুমোতে যাবার আগে বাথরুমে গেলেও এখন অরূপকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে। কিন্তু এ যে আরেক নতুন আপদ মনে হচ্ছে ওর। শেষোব্দি অরূপকে বলে, "চলো না একটা কীর্তন দিই বাড়িতে। লোকনাথ বাবার।" অরূপ রাজি হয়ে যায়। জন্মাষ্টমীর দিন লোকনাথ মিশনের কীর্তন দল এসে পুজো-পাঠ করে , খোল-কর্তাল বাজিয়ে কীর্তন করে সারা বাড়ি মাত করে তোলে। পাড়ার সবার নেমন্তন্ন ছিল। প্রাসাদে ছিল ফ্রাইরাইস, মটর-পনির, ছোলার ডাল, আলুভাজা, চাটনি, রসগোল্লা। সবাই তৃপ্ত হয়ে খেয়ে বাড়ি যায়। সেই রাতের পর থেকে নমিতা আর কোনোদিনও ভয় পায়নি বাড়িতে, একা থাকলেও।
No comments:
Post a Comment