কালো বেড়ালটা
জয়িতা ভট্টাচার্য
একটানা ঝিপঝিপ বৃষ্টি সেই বিকেল থেকে।কিছু মানুষ ছাতায় আর কিছু লোক বিনা ছাতায় ভিজে চুপচুপে হয়ে ফিরছে বাসায় ওই কাকেদের মত,যারা বসে আছে আমার জানলার সামনের তারে।
ঘরে আবছা অন্ধকারে মা শুয়ে আছে। আলো জ্বালিনি ঘুম ভেঙে যেতে পারে। তিন চারদিন এভাবেই।এখন আর সময় গুনি না।খুব কাশছিল আর জ্বর।ঘুমিয়েছে শেষে। ঘরে চাল আছে, ডাল,ডিম শেষ।বিস্কুট বয়ামের তলার দিকে কিছু আছে এখনও।মা ঘুমোচ্ছে।দুধ খেয়ে। দুধ আর নেই।আমি চুপচাপ ভাবছি অনেক কথা।গলায় ব্যথা। কাশি।হোক গে। মনে পড়ছে কত কথা।
সেই ভাঙা টালির ঘর। চ্যাংরাবান্ধা থেকে কয়েক মাইল ভেতরের গ্রাম।আমার বাবা,ছেঁড়া লুঙ্গি, মায়ের তাপ্পি দেওয়া শাড়ি শুকোচ্ছে দড়িতে?তখন বড্ড অভাব। মন ছোটো।ফুটপাথে বসে বিক্রি করতাম হরেক মাল।আমি আর দাদা। পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হোলো।তখন কলকাতা এক স্বপ্নের দেশ।দাদার ছিল অন্য স্বপ্ন, বাবারও।আমি চাইতাম টাকা।পথেঘাটে দামি জামা পরা সুন্দরী মেয়ে। আমার মা-ও সুন্দরী খুব। মা-ও সাচ্ছন্দ্য চেয়েছিল।
এখন বসে আছি নলিন সরকার স্ট্রিটে র শ্যাওলা ধরা প্রাচীন বাড়িটার দোতলার ছোট্ট ফ্ল্যাটে।মাঝে তিস্তা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল।
ঝড়ে ভেঙে গেছিল টালির চাল।ভিজে একাকার।বাবা তখন বিছানায় পেচ্ছাব পায়খানা করে ফেলে মা সব পরিষ্কার করত।সেই ঝড়ের রাতে দেখেছিলাম ঘরের কোণে প্রথমবার বেড়ালটাকে।হ্যারিকেনের আলোয় আবছা আরো কালো অন্ধকারের স্তূপ যেন। নিঃশব্দে এসে বসেছিল সে। অথচ কেউ দেখতে পায়নি।মা ও দেখতে পায়নি কোনো বেড়াল।
সে রাতে বাবা চলে গেল।
প্লাবন আর দাদার ফেরার হওয়া একই বছরে।
এসব ভাবতে ভাবতে পায়ের কাছে চলে এলো কালো বেড়ালটা।লাফিয়ে বসল উঠে মিটসেফের ওপর।ওর হলুদ চোখ জ্বলজ্বল করছে।একদৃষ্টে দেখছে মা কে।মা ঘুমিয়ে আছে।কদিন ধরেই আসছে ও।জাগাবো না এখন মা কে। দেখেছি এর পরেও ওকে একবার।
জ্বর আসছে আমার।শীত।
কী যেন ভাবছিলাম।
ঘর জমি বেচে এই কলকাতায়
শেষে এই আমি আর মা।কলেজস্ট্রিটের পুরোনো বইয়ের দোকান আমার।একজন ঢুকতে পারে এত ছোটো।তবু বই।অনেক বই পড়তে পারি।মাঝেমধ্যে দু একটা খদ্দের আসে।অতিমারীর লকডাউনের জন্য দোকান বন্ধ। অনেক বই জলে নষ্ট। আমার আর বিয়ে করা হয়নি।দাদাকে ওরা ধরে ফেলেছিল। কী সব স্বপ্ন দেখত। শুনেছি ওরা সরাসরি গুলি করেছিল বুকে। আমি দাদাকে এমন ঘুমোতে দেখেছি।ময়লা ছেঁড়া শার্টে কাদা আর রক্ত।সেবারেও দেখেছি বেড়ালটা ওই ঝোপের পেছনে দাদার আশপাশে ঘোরাঘুরি করছিল।চোখ দুটো...অথচ মা ,বোন ওরা কেউ দেখতে পায়নি কোনো বেড়াল।কেউ না। রক্ত মাখা বুকে মুখ ঠেকিয়ে রক্তের ঘ্রাণ নিচ্ছিল। সবজে দ্যুতি ঠিকরে বেরোচ্ছিল ওর চোখ থেকে।কী নিষ্ঠুর, কী নির্মম! এখন আর কিছু মনে হচ্ছে না।
দুধ নেই।আমি জাগাইনি আর মা কে।আলো জ্বালি।মৃদু হলদেটে আলো।পাখাটা পুরোনো।ধীরে ধীরে ঘুরছে,ব্লেডগুলো কালচে মথের মত উড়ছে গোল হয়ে।
এবারেও এল।তখনই চিনেছি ওকে।সেই এক কালো বেড়াল জ্বলজ্বলে হলুদ চোখ।
রাতে জ্বর বাড়ল। অনেক জ্বর। দম আটকে আসছে।মায়ের গা থেকে আধপচা গন্ধটাও আর পাচ্ছি না পাশে শুয়ে। দম আটকে আসছে আমার।উফ।একটু বাতাস চাই। হঠাৎ বুকে একটা ধাক্কা, শেষবার দেখতে পেলাম মুখের ওপর ঝুঁকে আছে দুটো তীব্র হলুদ চোখ
বাড়ির সামনে ভর দুপুরে খুব ভিড়।কাগজের প্রথম পাতায় " মা ও ছেলের মৃতদেহ উদ্ধার।বৃদ্ধার দেহে পচন ধরেছিল।পড়শিরা খবর দেয় থানায়... "
No comments:
Post a Comment