Sunday, 5 September 2021

অগ্নিশ্বর সরকার--লাভার ঘটনাটা



লাভার ঘটনাটা

অগ্নিশ্বর সরকার


একটা যান্ত্রিক শব্দ করে পাহাড়ের বাঁকে থেমে গেলো গাড়িটা। ঘড়ির সময় অনুযায়ী সূর্যদেবের এখন মধ্য গগনে থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে সূর্যদেব এখন ঘন মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। একটা ঝিঁ ঝিঁ ডাকা পথের বাঁকে একটা গাড়ির মধ্যে বন্দী দুই বন্ধু রাহুল আর অনির্বাণ। পাশে পাইনের ঘন জঙ্গল। নিস্তব্ধতাটা রাহুল-ই ভাঙল।

-    তোকে আগেই বলেছিলাম গাড়িতে একটা ড্রাইভার আন , কথাটা শুনলে আজ আমাদের এই অবস্থাটা হত না অনি। এখন কীভাবে একটা মেকানিক পাবো কে জানে ?

-    এখন আমাদের দরকার একজন মেকানিকের ড্রাইভারের নয়। তুই প্লিজ সমস্যাটা ঠিকভাবে ব্যক্ত কর।

দুই বন্ধুর কথাবার্তার জোরে পাশের গাছের মাথা থেকে কতগুলো অজানা পাখি উড়ে গেল। এই ওয়েদারে নেওড়া ভ্যালির এদিকে কোনও পর্যটকও আসবে না। 

অনির্বাণ গত মাসে বোনাস পেয়ে সেকেন্ডহ্যান্ড ইনোভা কিনেছে। তারপর প্ল্যান লাভা। সাথে ছোটবেলার বন্ধু রাহুল। রাহুল অনেকবার বলেছিল একে সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি তার উপর এতোটা রাস্তা। কর্ণপাত করেনি অনির্বাণ। আজ ছাঙ্গে জলপ্রপাত দেখে ফেরার পথে এই বিপত্তি। এখন অফ সিজন। রাহুলরা ছাড়া আর কোনও পর্যটকের দেখা ছিলোনা ছাঙ্গেতে। গাড়ি থেকে বেরিয়ে বনেট খুলে দুই বন্ধুতে গবেষণা শুরু করল। হঠাৎ চড়বড়িয়ে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি শুরু হল। কোনওরকমে গাড়ির বনেট নামিয়ে দুই বন্ধুতে আশ্রয় নিল গাড়ির ভিতরে। 

পাহাড়ের বৃষ্টি খুব ভয়ঙ্কর। একে তো ধ্বস নামার প্রবল সম্ভবনা তার উপর বাজ পড়ার আতঙ্ক। গাড়ির ভিতরে ঢুকে চারদিকের ইন্ডিকেটরগুলো জ্বালিয়ে দিল অনির্বাণ। গাড়ির ড্রাইভিং সিটটাকে একটু পিছন দিকে ঠেলে আরাম করে বসল। আবহাওয়াটা এক ঝটকায় কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে গেছে। গাড়ির সব কাঁচগুলো তুলে দিলেও বেশ ঠাণ্ডা আছে ভিতরটা। যদিও ক্যালেন্ডারের হিসাবে সময়টা আগস্ট মাসের শেষ। দুজনে গুনগুন করে কথা বলতে শুরু করল। বৃষ্টিটা আপাতত ঘণ্টাখানেকের মধ্যে থামবে বলে মনে হয় না।

রাহুলের দিকের কাঁচের উপর ধাক্কায় গল্পটা ভেঙ্গে গেল। একটি লোক পুরো কাকভেজা হয়ে কাঁচে ধাক্কা দিচ্ছে। তড়িঘড়ি কাঁচটা অল্প নামিয়ে রাহুল প্রশ্নটা ছুঁড়ল – 

-    কে আপনি? কী দরকার?

দরজার বাইরের লোকটা অদ্ভূত ঘড়ঘড়ে গলায় বলল –

-    সামনেই আমার গাড়িটা স্কিড করে গাছে ধাক্কা মেরে বন্ধ হয়ে গেছে। আমার স্ত্রীর চোট লেগেছে। আপনারা যদি একটু যেতেন তবে...

-    অবশ্যই যাবো। চলুন।

খুব কাছেই প্রচণ্ড জোরে শব্দ করে একটা বাজ পড়ল। সেই আলোতে লোকটার মুখটা কেমন যেন লাগলো রাহুলের। অজস্র বলিরেখার ভিড়ে মুখের নমনীয়তাটা হারিয়ে গেছে। 

গাড়ির দুদিকের দরজা খুলে দুই বন্ধু বেরিয়ে গেল। একটু বাদে বৃষ্টির মধ্যেই ভদ্রলোক আর তার স্ত্রীকে নিয়ে গাড়ির মধ্যে বসানো হল। ভদ্রমহিলার মাথায় একটু চোট লেগেছে। গুরুতর নয়। অনির্বাণ গাড়ির চাবিটা ঘোরাতেই গাড়িটা অদ্ভূতভাবে স্টার্ট হয়ে গেল। বৃষ্টির জোরটা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। চারদিকের ইন্ডিকেটারগুলো জ্বালিয়ে এগিয়ে চলল লাভার দিকে। হঠাৎ করে গোটা এলাকাটা কুয়াশার চাদরে মুড়ে গেছে। সেই কুয়াশার চাদরের বুক চিরে গাড়িটা এগিয়ে চলছে। 

বৃষ্টিটা একদম ধরে গেছে। আকাশে সুয্যিমামা উঁকি দিয়েছে। একটু শুনশান জায়গা দেখে গাড়িটা ব্রেক টিপে থামালো অনির্বাণ। 

-    দাদা আপনি বৌদিকে নিয়ে নেমে যান। এখানেই গাড়ি পেয়ে যাবেন। আমাদের কাজ আছে। 

লোকটি মুখটা তেঁতো করে নেমে পড়ল। অনির্বাণ গাড়িটা ঘুরিয়ে ফেলে আসা পথের দিকে চলে গেল। অনির্বাণরা চলে যাওয়ার মিনিট পাঁচের মধ্যে একটা গাড়ি পেয়ে গেল লোকটি। গাড়ির ড্রাইভারকে লোকটি পুরো ঘটনা বিবৃত করল। ড্রাইভার বলল –

গতবছর একটা দুর্ঘটনায় দুই বন্ধু মারা গেছে। তারপর থেকে কেউ বিপদে পড়লেই তাদের দেখা যায়। অনেককে বাঁচিয়েছে। গাড়ির মধ্যে হঠাৎ করে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

 



No comments:

Post a Comment

সম্পাদকীয়--

সম্পাদকীয়-- অজানার মাঝে রহস্যময়তা লুকিয়ে থাকে। জন্ম-মৃত্যু বুঝি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড়  রহস্য। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আমরা অভ্যস্ত, অভ...